ফজিলতে পূর্ণ জিলহজের প্রথম দশক মাওলানা শিব্বীর আহমদ।

কথাকে জোড়ালো করার জন্যে আমরা আল্লাহ পাকের নামে কসম করি। তিনি মহামহিম, তিনি সবচেয়ে বড়। তাঁর কথায় কোনো রকম মিথ্যা কিংবা সংশয়ের লেশমাত্র নেই। এরপরও তিনি পবিত্র কুরআনের বহু জায়গায় কসম করেছেন। কসম কখনো করেছেন নিজের সত্তার নামে, কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তিনি অন্য কিছুর নামে কসম করেছেন। যে নামেই কসম করেন না কেন, সবই তো তাঁর সৃষ্টি। তাঁর সৃষ্টির বাইরে তো কিছুই নেই। তিনি তাই তাঁর সৃষ্টিজগতের মধ্য থেকে যা কিছু বড় কিংবা শ্রেষ্ঠ, সেসবের নামে কসম করেছেন।

সুরা ফাজরে তিনি কসম করেছেন জিলহজ মাসের প্রথম দশ রাতের নামে ‘শপথ ঊষার, শপথ দশ রাতের।’ [আয়াত : ১-২] বোঝাই যাচ্ছে, সপ্তাহের সাতদিনের মাঝে

জুমাবার যেমন বিশেষ মর্যাদায় পূর্ণ, বছরের বার মাসের মাঝে রমজান মাস যেমন অনন্য বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত, রমজানের ভেতরেও আবার শেষ দশক তুলনামূলক বেশি মর্যাদাপূর্ণ, ঠিক তেমনি জিলহজ মাসের প্রথম দশ দিন বিশেষ ফজিলত ও মর্যাদায় ভাস্বর।

সাধারণভাবে কোনো দিন মাস কিংবা কোনো সময়ের বিশেষ ফজিলতের কথা বর্ণিত হলে আমাদের উচিৎ সে সময়টাকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া, বেশি বেশি ইবাদত করা। যদি সে বিশেষ সময়ের কোনো বিশেষ আমলের কথা কুরআনে বা হাদীসে বর্ণিত হয়ে থাকে, তাহলে তা মনোযোগসহ আদায় করা। অন্যথায় যে কোনো নফল ইবাদত যেমন, নামাজ, তেলাওয়াত ইত্যাদি বেশি বেশি করা এবং ফরজ আমলগুলো ঠিক ঠিক আদায় করা। মহিমান্বিত এ দশকের ইবাদত সম্পর্কে হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে: এ দশদিনের কোনো নেক আমল আল্লাহর কাছে যত প্রিয়, অন্য কোনো সময়ের আমল তাঁর কাছে এতটা প্রিয় নয়। [তিরমিযী শরীফ,হাদীস নং ৭৫৭]

এ দশকের একটি উল্লেখযোগ্য নফল ইবাদত হচ্ছে আরাফার দিনে অর্থাৎ ৯ জিলহজ রোজা রাখা। হাদীস শরীফে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আরাফার দিনের রোজা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল। তিনি উত্তরে বলেছেন, তাতে আগের ও পরের দুই বছরের গোনাহ মাফ করে দেয়া হয়। [মুসলিম শরীফ, হাদীস নং ২৮০৪]

জিলহজ মাস প্রাচীন আরবেও একটি সম্মানিত মাস হিসেবে বিবেচিত হতো। এ মাসে তারা যুদ্ধ-বিগ্রহ করত না। ইসলামের আগমনের পরও এ মাসের পূর্ব থেকে চলে আসা সম্মান অটুট থাকে। এমন সম্মানিত মাস আরও আছে। জিলকদ, মহররম ও রজব। কিন্তু এ সম্মানিত চার মাসের মধ্যেও জিলহজ মাস সম্মান ও মর্যাদায় অনন্য। বিশেষত এ মাসের প্রথম দশক। এর মূল কারণ হিসেবে আমরা দুটি ইবাদতের কথা উল্লেখ করতে পারি, যেগুলো কেবল এ মাসেই আদায় করা যায়। একটি হজ, আরেকটি কুরবানি।

হজ ইসলামের পাঁচ স্তম্ভের একটি। রমজান মাসের রোজা শেষে যে দিনটিতে মুসলমানগণ ঈদ পালন করে, সারা মাসের অবিচ্ছিন্ন সিয়াম সাধনার পর নগদ পুরস্কার লাভ করে যে দিন, সে দিন থেকেই শুরু হয়ে যায় হজের মাস। সে দিনটি শাওয়াল মাসের প্রথম দিন। এ দিন থেকেই হজের ইহরাম বাঁধার সময় শুরু হয়।

আগেকার দিনে, যখন কয়েক মাস সফর করে মানুষ হজ করতে যেত, তখন ঈদের দিন থেকে তারা ইহরাম বাঁধতে পারত। এর আগে হজের ইহরাম যদি কেউ বেঁধে নেয় তাহলে তা শুদ্ধ হবে না। হজের ইহরাম বেঁধে হাজী সাহেবগণ পবিত্র মক্কা শরীফের দিকে ছুটে যান। কেউ আগে কেউ পরে। কিন্তু জিলহজের প্রথম দশকের একেবারে শেষ প্রান্তে, নয় তারিখে সকলেই আরাফার মাঠে উপস্থিত! নয় তারিখে সূর্য পশ্চিম আকাশে হেলে পড়ার পর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত আরাফার ময়দানে অবস্থান করা হজের প্রধান ফরজ। হজের কাজগুলো যদিও আট জিলহজ থেকে বার জিলহজ পর্যন্ত, কিন্তু নয় তারিখের এ আরাফার মাঠে অবস্থানই হজের মূল কাজ। সময়মতো এ আমল আদায় না করলে হজই আদায় হবে না।

কিন্তু বরকতময় এ হজের কাফেলায় তো সকল মুসলমান শরিক হতে পারে না। বরং ব্যয়বহুল ও কষ্টকর এ ইবাদতটি জীবনে মাত্র একবারই ফরজ। তাও যাদের সামর্থ্য আছে তাদের জন্যে। কেউ কেউ অবশ্য একাধিকবারও হজ পালন করতে যায়। কেউ কেউ বার বার যায়। তবে যারা এতে শরিক হতে পারছে না তাদের জন্যে রয়েছে কুরবানির বিধান।

হাজী সাহেবগণ নয় জিলহজ আরাফার মাঠে অবস্থান শেষে রাতে রওনা হন মুজদালিফার দিকে। সেখানে সকাল পর্যন্ত থেকে চলে যান মিনায়। মিনায় গিয়ে জামারায় কংকর নিক্ষেপ করতে হয়। এবং করতে হয় কুরবানি।

আল্লাহর আদেশ ও ভালোবাসার সামনে হযরত ইবরাহীম আ. আপন পুত্র হযরত ইসমাইল আ.এর প্রতি স্নেহ ও ভালোবাসাকে বিসর্জন দিয়ে তাকে যে কুরবানি করতে চেয়েছিলেন এবং সেজন্যে চেষ্টাও করেছিলেন, এরই স্মৃতিবিজড়িত আমল হচ্ছে এ কুরবানি। হজের সঙ্গে মিল রেখে অন্য মুসলমানদের জন্যেও এদিনে কুরবানির বিধান দেওয়া হয়েছে, যেন এ মহান আমলটিতে শরিক হতে না পারলেও নিজ নিজ জায়গা থেকেই এর সঙ্গে কিছুটা সাদৃশ্য কমপক্ষে অবলম্বন করা যায়।

ইহরাম বাঁধার পর থেকে হাজী সাহেবগণ নখ চুল কিছুই কাটতে পারেন না। দশ তারিখে পাথর মেরে কুরবানি করার পর তারা চুল মুণ্ডিয়ে কিংবা ছেটে হালাল হন এবং নখ-চুল না কাটার বিধান থেকে বেরিয়ে আসেন। ঠিক একইভাবে যারা হজে না গিয়েও কুরবানি দেবে, হাদীস শরীফে তাদেরকেও বলা হয়েছে যেন জিলহজ মাস আসার পর নখ-চুল কিছুই না কাটে। কুরবানি আদায় করার পর তাদের নখ-চুল কাটবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, কেউ যদি কুরবানি দিতে চায়, তাহলে জিলহজ মাস আসার পর যেন সে আর তার নখ-চুল না কাটে। [মুসলিম শরীফ, হাদীস ৫২৩৩]

আরেক হাদীসে আছে, এক সাহাবী একবার হযরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট জানতে চেয়েছেন, ‘আমার একটি মাত্র দুধের বকরি আছে। আমি কি তা কুরবানি করে দেব?’ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘না, তুমি বরং তোমার নখ-চুল কাটো, গোফ ছোট করো আরনাভির নিচের পশম পরিস্কার করো। আল্লাহ পাকের নিকট এটাই তোমার কুরবানির পূর্ণতা হিসেবে বিবেচিত হবে।’ [আবু দাউদ, হাদীস : ২৭৯১] এ হাদীসের ভাষ্য অনুসারে যারা কুরবানি দেবে এবং যারা দেবে না, সকলের জন্যেই এক কথা, তারা জিলহজ মাসের চাঁদ দেখা গেলে আর নখ-চুল কাটবে না। যারা কুরবানি দেবে তারা কুরবানি করার পর কাটবে, আর যারা কুরবানি দেবে না তারা ঈদের নামাজ শেষে যখন কুরবানি করার সময় হয় তখন কাটবে। হজপালনরত ভাগ্যবানদের জন্যে ক্ষণে ক্ষণে আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে যে রহমত নাজিল হতে থাকে, কুরবানি ও এর পূর্বে দশদিন নখ-চুল কাটা থেকে বিরত থেকে তাদের সঙ্গে সামান্য সাদৃশ্য অবলম্বন করে আশা করা যায়, সে রহমত কিছুটা হলেও আমাদের ভাগ্যে জুটবে।

এ দুটি ইবাদতই এমন, এগুলো বছরের অন্য কোনো সময় আদায় করার সুযোগ নেই। নির্দিষ্ট দিনের নির্দিষ্ট সময়েই তা আদায় করতে হয়। হজের কথাই ধরুন। নয় তারিখ দুপুর থেকে আরাফার মাঠে অবস্থান করা যে হজের মূল স্তম্ভ, সেই আরাফার মাঠে কেউ যদি অন্য সময় গিয়ে মাসের পর মাসও পড়ে থাকে, এটা তার জন্যে কোনো ইবাদত হবে না। দশ তারিখ থেকে বার-তের তারিখ পর্যন্ত মিনার মাঠে স্থাপিত শয়তানের প্রতীকি স্তম্ভে যে পাথর মারতে হয় তা কেবল ঐ সময়ই ইবাদত। তের তারিখে না মেরে চৌদ্দ তারিখে কিংবা দশ তারিখের পূর্বে নয় তারিখে যদি কেউ সে স্তম্ভগুলোতে পাথর মারে তা কোনো ইবাদত হবে না। কুরবানির বিষয়টিও এমনই। জিলহজ মাসের দশ তারিখ অর্থাৎ ঈদুল আজহার দিন ঈদের নামাজের পর থেকে বার তারিখ সূর্যাস্ত পর্যন্ত কুরবানির সময়। যদি কেউ এ নির্ধারিত সময়ের আগে কুরবানি দেয়, এমনকি দশ তারিখ ঈদের নামাজের পূর্বেও কুরবানি দেয় কিংবা বার তারিখের পর কুরবানি করতে চায় তাহলে তা কুরবানি বলে বিবেচিত হবে না। যে কুরবানি ইবাদত বলে গণ্য, সে কুরবানি করতে হলে নির্ধারিত সময়েই করতে হবে। অন্য যত ইবাদত, সবই তো নফল হিসেবে সময়ের পরেও করা যায়। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের নির্ধারিত সময়ের বাইরে নফল নামাজ, রমজান মাসের বাইরে নফল রোজা, নির্ধারিত জাকাতের অতিরিক্ত নফল দান-সদকা সবই চলে। কিন্তু এ হজ আর কুরবানি এমন, যেখানে নির্ধারিত সময় মেনে চলাও বাধ্যতামূলক।

আরেকটি বিষয়, এ দুটি ইবাদতই এমন, যেখানে আমাদের যুক্তি সম্পূর্ণ অচল। নামাজ-রোজা-জাকাতের বিষয়ে তো অনেক যুক্তিই আমাদের মাথায় আসে, কিন্তু হজ-কুরবানি এক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। হজ করতে সকলকেই তো ছুটে যেতে হয় পবিত্র নগরী মক্কা মুকাররমায়। হাজী সাহেবগণ পবিত্র বায়তুল্লাহর তওয়াফ করেন। প্রিয় প্রভুর প্রিয় ঘরের প্রতি এক অপার্থিব ভালোবাসায় তারা ঘুরতে থাকেন বায়তুল্লাহর চারপাশে। কিন্তু সতর্ক থাকতে হয়, যেন তওয়াফ চলাকালীন সে ঘরের দিকে চোখ না যায়। অথচ তওয়াফের বাইরে কালো গিলাফে আবৃত সে ঘরটির দিকে তাকিয়ে থাকলেও নেকি পাওয়া যায়। বায়তুল্লাহর চারপাশে মসজিদুল হারাম, যেখানে এক রাকাত নামাজে এক লক্ষ রাকাত নামাজের সওয়াব হয়। অথচ জিলহজ মাসের আট তারিখে, যখন হজের মূল পর্ব শুরু হয়, তখনই হাজী সাহেবদের প্রতি নির্দেশনা মসজিদুল হারামের এক লক্ষ গুণ সওয়াবের সুযোগ রেখে এবার চলে যেতে হবে মিনার মাঠে, যেখানে মসজিদুল হারামের মতো সকলে একত্রে নামাজ আদায় করার কোনো ব্যবস্থাও নেই। এরপর আরাফা-মুজদালিফায়, এরপর আবার মিনায়। এক ফাঁকে মসজিদুল হারামে গিয়ে একবার তওয়াফ-সাঈ করে আসতে হয়।

কেউ যদি এক লক্ষ গুণ সওয়াবের আশায় মিনা-আরাফা-মুজদালিফায় না গিয়ে থেকে যেতে চায় মসজিদুল হারামে, তাহলে তার হজই বাতিল হয়ে যেতে পারে। কুরবানির বিষয়টিও অভিন্ন। এই যে আমাদের দেশে লাখ-লাখ পশু কুরবানি হচ্ছে, বাহ্যত এর কী যুক্তি হতে পারে! অনেকে তো বলেই ফেলে, কুরবানি না করে এ টাকা গরীব-দুঃখীদের মাঝে বিলিয়ে দিলে আরও ভালো হয় না? আমরা বলি, এটাই কুরবানি। এখানে যেমন নিজের কষ্টার্জিত টাকায় কেনা পশু কুরবানি করা হয়, কুরবানি করা হয় শরিয়তের বিধানের সামনে সকল প্রবৃত্তিকেও। এই হজ এই কুরবানি আমাদের স্পষ্টতই এ শিক্ষা দিয়ে যায়Ñ শরিয়তের বিধান যেমনই হোক, আমাদের যুক্তিতে তা বোঝে আসুক আর নাই আসুক, মাথা পেতে মেনে নিতে হবে সে বিধান। যুক্তির ঘোড়া দৌড়িয়ে সেই বিধানে সামান্যতম হেরফের করার কোনো সুযোগও আমাদের নেই। মানুষের স্বাভাবিক যুক্তির ঊর্ধ্বে থাকা এ দুটি ইবাদত থেকে এ শিক্ষা গ্রহণ করে তা ছড়িয়ে দিতে হবে জীবনের অন্য সকল ক্ষেত্রে। হজ ও কুরবানির স্বার্থকতা এখানেই।

লেখক: প্রাবন্ধিক, উস্তাদ, জামিয়াতুল উলুমিল ইসলামিয়া ঢাকা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.